বাচ্চাদের পেটের সমস্যা? জানুন এর লক্ষণ ও প্রকারভেদ
বাচ্চাদের পেটের সমস্যা? জানুন এর লক্ষণ ও প্রকারভেদ
ছোট বাচ্চাদের মধ্যে পেট ব্যথা বা হজমজনিত সমস্যা যেন নিত্যদিনের ব্যাপার। হঠাৎ করে খাওয়া বন্ধ, পেটে মোচড়, কিংবা বাথরুমে বারবার যাওয়া—এসব দেখে অনেক সময় বাবা-মায়েরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু আপনি কি জানেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যাগুলো সাধারণ এবং সাময়িক?
এই প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো, শিশুদের পেটের সমস্যা কেন হয়, কী কী লক্ষণ দেখা দিলে চিন্তা করতে হবে, এবং কোন ধরণের পেটের সমস্যা কীভাবে চেনা যায়। সেই সঙ্গে জানবেন কখন ঘরোয়া চিকিৎসা যথেষ্ট, আর কখন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়া জরুরি।
সাধারণ পেটব্যথা থেকে শুরু করে গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, কিংবা খাবারে অ্যালার্জি—প্রতিটি বিষয়কে আলাদা আলাদা করে ব্যাখ্যা করবো যাতে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন আপনার সন্তানের অবস্থা কেমন।
শিশুদের হজম প্রক্রিয়া সম্পর্কে বোঝাপড়া
কেন শিশুদের পেটের সমস্যা বেশি হয়
শিশুদের হজম প্রক্রিয়া এখনো পরিপূর্ণভাবে গঠিত হয়নি। এ কারণে অনেক সাধারণ কারণেই তাদের পেটে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন ধরুন, বাচ্চারা খেলতে খেলতে মাটিতে হাত দিচ্ছে, সেখান থেকে মুখে তুলছে—ফলে জীবাণু সহজেই দেহে প্রবেশ করে। সেই সঙ্গে ছোটদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে দুর্বল, যার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
তাছাড়া, অনেক শিশু এক ধরনের খাবার খেতে খুব পছন্দ করে, কিন্তু সেটি তাদের পেটের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। চকলেট, চিপস, কোল্ড ড্রিংক ইত্যাদি খাবারগুলো শিশুদের পেটে গ্যাস, অ্যাসিড কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি করতে পারে।
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিশুদের মানসিক অবস্থা। অনেক সময় দুশ্চিন্তা, ভয় বা উদ্বেগের কারণেও শিশুদের পেটে ব্যথা হতে পারে। এটি "স্ট্রেস ইনডিউসড অ্যাবডোমিনাল পেইন" নামে পরিচিত। বিশেষ করে পরীক্ষার সময়, নতুন স্কুলে যাওয়ার সময় বা পারিবারিক সমস্যা থাকলে এ ধরণের সমস্যা বেশি দেখা যায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের হজম ব্যবস্থার পার্থক্য
একজন শিশুর হজম প্রক্রিয়া প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এই পার্থক্যগুলো জানলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন কেন অনেক সময় একসাথে খাওয়া খাবার একজন বড়দের কিছুই করলো না, অথচ শিশুর পেট গড়িয়ে গেলো।
এনজাইমের স্বল্পতা: অনেক শিশুর দেহে প্রয়োজনীয় হজমকারী এনজাইম পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না। ফলে ল্যাকটোজ বা গ্লুটেন জাতীয় উপাদান হজম করতে সমস্যা হয়।
তীব্র প্রতিক্রিয়া: শিশুদের অন্ত্রের প্রাচীর তুলনামূলকভাবে নরম ও সংবেদনশীল। ফলে বাইরের জীবাণু প্রবেশ করলে তা দ্রুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
দ্রুত বিপাকীয় হার: বাচ্চাদের মেটাবলিজম অনেক বেশি, যার কারণে খাবার দ্রুত হজম হয়। তবে তা হজমজনিত সমস্যার আশঙ্কাও বাড়িয়ে দেয়।
কম পানি গ্রহণ: অনেক শিশু পানি খেতে চায় না। এতে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, যা পেটের সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হতে পারে।
এই পার্থক্যগুলো জানার মাধ্যমে আপনি শিশুর খাবার ও অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনলেই অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।
শিশুদের মধ্যে পেটের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলো
গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস (স্টমাক ফ্লু)
গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস বা স্টমাক ফ্লু হল এমন একটি সংক্রমণ যা পাকস্থলি ও অন্ত্রে প্রভাব ফেলে। এটি সাধারণত ভাইরাসজনিত, তবে ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীও এর জন্য দায়ী হতে পারে। শিশুদের মধ্যে এটি খুব সাধারণ এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
লক্ষণসমূহঃ
বমি
পাতলা পায়খানা
হালকা থেকে মাঝারি জ্বর
পেট ব্যথা
শরীরে দুর্বলতা বা অবসাদ
গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস সাধারণত ২-৩ দিনের মধ্যে সেরে যায়, তবে বাচ্চার দেহে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যেটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদি আপনি লক্ষ করেন শিশুর ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে, চোখ গর্ত হয়ে যাচ্ছে বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে, তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
যা করবেন:
প্রতি ১০-১৫ মিনিট পর পর অল্প অল্প পানি বা ওরস্যালাইন খাওয়ান
দুধ, চিনি ও কোলা জাতীয় পানীয় থেকে বিরত রাখুন
হালকা স্যুপ, খিচুড়ি বা সেদ্ধ খাবার দিন
কোষ্ঠকাঠিন্য
শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য (Constipation) একটি অতি সাধারণ সমস্যা, যা অনেক সময় তারা নিজেরা প্রকাশ করতেও পারে না। এটি তখনই হয় যখন মলত্যাগ অনিয়মিত হয় বা মল শক্ত হয়ে যায়, যার ফলে মলত্যাগ কষ্টকর হয়ে পড়ে। এটি শুধু শারীরিক অস্বস্তিই নয়, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে।
কারণসমূহঃ
আঁশ বা ফাইবারযুক্ত খাবারের অভাব
পানি কম পান করা
সময়মতো টয়লেটে না যাওয়া
মানসিক চাপ বা স্কুলে টয়লেট ব্যবহার না করার অভ্যাস
লক্ষণসমূহঃ
সপ্তাহে ২ বা তার কমবার মলত্যাগ
মলত্যাগের সময় ব্যথা বা কান্না
পেট ফাঁপা, অস্বস্তি
খাওয়া-দাওয়ায় অনীহা
অনেক সময় শিশু পায়খানা চেপে রাখে, কারণ হয়তো একবার ব্যথা পেয়েছে, তাই আর যেতে চায় না। এতে সমস্যা আরও বাড়ে। কিছু শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটু একটু করে মল বের হয় কিন্তু পুরোপুরি পরিষ্কার হয় না।
সমাধান কী?
খাবারে প্রচুর ফলমূল ও শাকসবজি যোগ করুন
প্রচুর পানি পান করতে উৎসাহ দিন
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করান
প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় টয়লেটে বসার অভ্যাস করান
একান্ত প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মল নরম করার ওষুধ বা সিরাপ দেওয়া যেতে পারে, তবে তা নিয়মিত ব্যবহার করা উচিত নয়।
খাবারে অ্যালার্জি বা অসহিষ্ণুতা
শিশুরা বিভিন্ন ধরণের খাবারের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে, বিশেষ করে দুধ, ডিম, গম, সয়া বা সামুদ্রিক মাছ। এই সংবেদনশীলতা দুইভাবে প্রকাশ পায়—একটি হলো অ্যালার্জি, আরেকটি হলো খাদ্য অসহিষ্ণুতা (Intolerance)।
অ্যালার্জির লক্ষণঃ
পেটে ব্যথা
গ্যাস বা ফাঁপা পেট
ডায়রিয়া
ত্বকে চুলকানি বা র্যাশ
শ্বাসকষ্ট (গুরুতর ক্ষেত্রে)
খাদ্য অসহিষ্ণুতা লক্ষণঃ
খাবার খাওয়ার ১-২ ঘণ্টা পর পেটের অস্বস্তি
গ্যাস বা গর্জন
কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাতলা পায়খানা
ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স একটি খুব সাধারণ সমস্যা যেখানে শিশু দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার হজম করতে পারে না। অনেক সময় এটা নির্ণয় করা কঠিন হয় কারণ উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে দেখা দেয়।
কি করবেন?
সন্দেহজনক খাবারগুলো বাদ দিয়ে একে একে আবার শুরু করে পর্যবেক্ষণ করুন
একটি খাদ্য ডায়েরি তৈরি করুন
প্রয়োজনে অ্যালার্জি টেস্ট করান
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়েট পরিবর্তন করুন
অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও GERD
অনেক ছোট শিশু বা নবজাতকের ক্ষেত্রে দেখা যায় খাবার খাওয়ার পর মুখ দিয়ে দুধ বা খাবার উঠে আসে। এটি যদি মাঝে মাঝে ঘটে, তবে এটি সাধারণ রিফ্লাক্স। কিন্তু যদি এই ঘটনা নিয়মিত ঘটে এবং শিশুর ওজন না বাড়ে, ঘন ঘন কান্না করে বা খাওয়ার সময় বিরক্তি দেখায়, তাহলে এটি GERD (Gastroesophageal Reflux Disease) হতে পারে।
লক্ষণসমূহঃ
বারবার বমি হওয়া
খাওয়ার সময় কান্না
পেটের মধ্যে জ্বালাপোড়া
রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া
কাশি বা শ্বাসকষ্ট
কেন হয়? শিশুদের পাকস্থলির উপরের ভাল্বটি (Lower Esophageal Sphincter) পুরোপুরি শক্তিশালী নয়, ফলে খাবার উপরে উঠে আসে।
কি করবেন?
শিশুকে খাওয়ানোর পর কিছুক্ষণ সোজা অবস্থায় রাখুন
অতিরিক্ত খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন
বালিশে একটু উঁচু করে ঘুমাতে দিন
ঘন ঘন অল্প অল্প করে খাওয়ান
যদি উপসর্গগুলো বেশি তীব্র হয়, তাহলে শিশুর ওজন ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসা নিতে হবে।
পরজীবী সংক্রমণ
পেটের পরজীবী বা “প্যারাসাইট” সাধারণত মাটি, অপরিষ্কার খাবার বা পানির মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এটি খুব সাধারণ সমস্যা।
সবচেয়ে পরিচিত পরজীবীগুলো হলোঃ
অ্যাসকারিস (সাধারণ কৃমি)
গার্ডিয়া
হুকওয়ার্ম
টেপওয়ার্ম
লক্ষণসমূহঃ
পেটব্যথা
পাতলা পায়খানা বা কোষ্ঠকাঠিন্য
ওজন কমে যাওয়া
চুলকানিসহ ত্বকের সমস্যা
খাওয়ার পরও ক্ষুধা থাকা
প্রতিরোধ ও চিকিৎসা:
প্রতি ৬ মাসে কৃমিনাশক খাওয়ানো
হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা
ফুটানো পানি পান করানো
সবজি ও ফল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়ানো
যদি শিশুর পেট ফুলে থাকে এবং সে সবসময় ক্লান্ত থাকে, তাহলে প্যারাসাইটিক সংক্রমণ থাকতে পারে।
লক্ষণ চেনার উপায়
শারীরিক লক্ষণ
শিশুরা সবসময় তাদের অসুস্থতা স্পষ্টভাবে বলতে পারে না। তাই বাবা-মা বা অভিভাবকদের উচিত তাদের শরীরের পরিবর্তনের দিকে সতর্কভাবে নজর দেওয়া। অনেক সময় ছোট একটি লক্ষণ বড় সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণগুলোঃ
পেট ব্যথা বা মোচড় ধরা: শিশুরা মাঝে মাঝে হঠাৎ পেট চেপে ধরে, কাঁদে বা ব্যথার কথা জানায়।
বমি বা বমির ভাব: এটি সংক্রমণ, খাবার অসহিষ্ণুতা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের লক্ষণ হতে পারে।
পাতলা পায়খানা বা কোষ্ঠকাঠিন্য: হজমে সমস্যা বা প্যারাসাইটিক সংক্রমণের ইঙ্গিত।
গ্যাস বা পেট ফাঁপা: অ্যালার্জি, গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস বা খারাপ খাবারের কারণে হয়।
জ্বর: পেটের ভাইরাসের সঙ্গে অনেক সময় হালকা থেকে মাঝারি জ্বর হয়।
দুর্বলতা ও খাওয়ায় অনীহা: শিশুর শরীরে পুষ্টির ঘাটতি বা সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে।
শিশু যদি দিনে বারবার পেট ব্যথা বা অস্বস্তির কথা বলে, তাহলে এটি কেবল সাধারণ গ্যাস্ট্রিক নয়—এটি হতে পারে কিছু দীর্ঘস্থায়ী অসুবিধার লক্ষণ।
আচরণগত পরিবর্তন
শিশুর আচরণ হলো তার শরীরের আয়না। অনেক সময় শিশুর আচরণ দেখে বোঝা যায় সে অসুস্থ কিনা। যেমন:
হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া: সবসময় খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকা শিশু যদি চুপ হয়ে যায় বা ঘুম ঘুম ভাব করে, এটি অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।
খাবারে অনীহা: পেট ব্যথা বা হজমজনিত সমস্যার কারণে শিশুরা খাবার এড়িয়ে চলে।
খেলার সময় বিরক্তি বা ঘন ঘন কান্না: শিশুর শরীরে অস্বস্তি থাকলে এটি তাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা কান্না করা: এটি GERD বা পেটের গ্যাসের কারণে হতে পারে।
ঘন ঘন টয়লেটে যাওয়া বা টয়লেট এড়িয়ে চলা: ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হতে পারে।
শিশুর দৈনন্দিন রুটিনে কোনো পরিবর্তন হলে তা লক্ষ্য করুন এবং লিখে রাখুন, যাতে প্রয়োজনে চিকিৎসককে বিস্তারিত জানাতে পারেন।
কোন লক্ষণগুলো গুরুতর
সব সমস্যাই বাড়িতে সমাধান করা যায় না। কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে:
দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র পেট ব্যথা
বমির সঙ্গে রক্ত আসা
মলে রক্ত বা কালো রঙের পায়খানা
৩ দিনের বেশি জ্বর থাকা
শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে যাওয়া, খুব ঘুম ঘুম ভাব বা জ্ঞান হারানো
প্রস্রাব না হওয়া বা খুব কম হওয়া
ওজন কমে যাওয়া বা ওজন না বাড়া
এই লক্ষণগুলো অনেক সময় ডিহাইড্রেশন, ইনফেকশন, বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জটিল রোগের ইঙ্গিত দেয়। দেরি না করে চিকিৎসা গ্রহণ করাই সবচেয়ে ভালো।
শিশুদের পেটের সমস্যার কারণসমূহ
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
আজকালকার শিশুরা ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত খাবার, কার্বনেটেড ড্রিংক ইত্যাদির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি, ফ্যাট ও কৃত্রিম উপাদান থাকে, যা সরাসরি পেটের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
যে অভ্যাসগুলো সমস্যার কারণ:
অতিরিক্ত চকলেট, আইসক্রিম বা ভাজাপোড়া খাওয়া
সময়মতো না খাওয়া বা অতিরিক্ত খাওয়া
তাড়াহুড়ো করে খাওয়া
পর্যাপ্ত পানি না পান করা
আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া
এছাড়া বাচ্চারা অনেক সময় খেলতে খেলতে খাবার খায় বা খাবারের সময় মোবাইল দেখে, যার ফলে হজম ঠিকভাবে হয় না।
সমাধান:
ঘরে তৈরি খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন
ফাস্ট ফুড সপ্তাহে একদিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন
প্রতিদিন ফলমূল ও সবজি অন্তর্ভুক্ত করুন
খাবারের সময় মনোযোগ দিয়ে খেতে উৎসাহ দিন
শিশুর খাদ্যাভ্যাস ভালো হলে পেটের অর্ধেক সমস্যাই দূর হয়ে যাবে।
ভাইরাস বা জীবাণুর সংক্রমণ
বাচ্চারা সবকিছু হাতে ধরে মুখে নেয়, খেলাধুলা করে মাটি-ধুলোয়, অন্য শিশুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে থাকে—ফলে তারা সহজেই সংক্রমণের শিকার হয়।
সাধারণ জীবাণুগুলোঃ
রোটা ভাইরাস: এটি ডায়রিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ
নোরো ভাইরাস: স্টমাক ফ্লু এর কারণ
ই. কোলাই, স্যালমোনেলা: খাবারের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ায়
কীভাবে ছড়ায়:
অপরিষ্কার পানি পান করলে
দূষিত বা অপরিচ্ছন্ন খাবার খেলে
হাত না ধুয়ে খাওয়ার ফলে
অসুস্থ শিশুর কাছ থেকে সংক্রমণ
প্রতিরোধে যা করতে হবে:
খাবারের আগে ও পরে হাত ধোয়ার অভ্যাস করান
সবসময় ফুটানো পানি পান করান
বাইরের খাবার এড়িয়ে চলুন
শিশুকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে উৎসাহ দিন
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
শিশুদের পেটের সমস্যা সবসময় শারীরিক কারণে হয় না। অনেক সময় মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ভয়ের কারণে পেটে ব্যথা, বমি ভাব, কিংবা খাওয়ায় অনীহা দেখা দিতে পারে। একে বলা হয় সাইকোসোম্যাটিক সমস্যা, যার মানে হলো—মানসিক কারণ শারীরিক উপসর্গ তৈরি করছে।
যেসব পরিস্থিতিতে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়ঃ
নতুন স্কুল বা ক্লাসে যাওয়া
পরীক্ষা বা হোমওয়ার্কের চাপ
বন্ধুদের সঙ্গে বিবাদ
পরিবারের মধ্যে ঝগড়া বা পরিবর্তন (যেমন, নতুন ভাই-বোন, স্থানান্তর)
ঘন ঘন বকা খাওয়া বা ভয় দেখানো
লক্ষণসমূহঃ
প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে পেট ব্যথা
কোন শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াই বারবার পেটব্যথার অভিযোগ
খাওয়ায় অনীহা
কান্না, ঘনঘন বিরক্ত হওয়া
রাতে ঘুম না হওয়া
প্রতিকার ও সমাধানঃ
শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন, মনোযোগ দিয়ে শুনুন
স্কুল ও বন্ধুদের বিষয়ে আগ্রহ দেখান
পরীক্ষার চাপ কমাতে উৎসাহমূলক কথা বলুন
ভালো আচরণে প্রশংসা করুন
শিশুকে তার পছন্দের কাজে ব্যস্ত রাখুন—যেমন আঁকা, গান, খেলা ইত্যাদি
মন ও শরীরের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। তাই শিশুর মানসিক অবস্থার প্রতি যত্নবান হওয়া জরুরি।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
বাসায় পর্যবেক্ষণ করার কৌশল
শিশুর পেটের সমস্যায় প্রথম ধাপে বাসায় কিছু পর্যবেক্ষণ ও হালকা ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এজন্য আপনাকে কিছু বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।
কীভাবে পর্যবেক্ষণ করবেনঃ
পেট ব্যথা কোথায় হচ্ছে—পেটের একদম মাঝখানে, নিচে না উপরে?
ব্যথা খাবার খাওয়ার পরে বাড়ে, নাকি কমে?
শিশুর প্রস্রাব ও মলত্যাগের পরিমাণ ও রঙ কেমন?
জ্বর, বমি বা ডায়রিয়া হচ্ছে কিনা
শিশুর মন-মেজাজ কেমন আছে—অত্যন্ত চুপচাপ, নাকি অস্বাভাবিক বিরক্ত?
একটি “সিম্পটম ডায়েরি” রাখা খুব কার্যকর হতে পারে। প্রতিদিন কখন, কী খেয়েছে, কোন লক্ষণ দেখা দিয়েছে তা লিখে রাখলে চিকিৎসকের কাছে বলতেও সুবিধা হয়।
সাধারণত ব্যবহৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা
যদি চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়, তিনি শিশুর অবস্থা দেখে কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা করতে পারেন, যেমন:
স্টুল টেস্ট: মলের মাধ্যমে জীবাণু বা প্যারাসাইট আছে কিনা পরীক্ষা করা
রক্ত পরীক্ষা: ইনফেকশন বা অ্যালার্জি চিহ্নিত করতে
আল্ট্রাসনোগ্রাফি: অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কোনো সমস্যা আছে কিনা দেখতে
অ্যালার্জি টেস্ট: কোন খাবার অ্যালার্জি সৃষ্টি করছে তা চিহ্নিত করতে
এন্ডোস্কোপি (জরুরি ক্ষেত্রে): অন্ত্রে কোনো জটিল সমস্যা আছে কিনা বোঝার জন্য
এসব পরীক্ষার মাধ্যমে পেটের সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সহজ হয়।
কোন লক্ষণ দেখলে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
সব সময় যে বাড়িতে চিকিৎসা সম্ভব, তা নয়। কিছু সংকেত দেখা দিলে কোনো রকম দেরি না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত:
একনাগাড়ে তিনদিনের বেশি জ্বর বা পাতলা পায়খানা
শিশুর প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া
বারবার বমি হওয়া এবং কিছু খেতে না পারা
মলের সঙ্গে রক্ত আসা
বমিতে রক্ত বা কালো রঙ দেখা যাওয়া
শিশু খুব দুর্বল হয়ে পড়া বা জ্ঞান হারানো
ওজন না বাড়া বা হঠাৎ করে কমে যাওয়া
পেটের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যথা জমে থাকা
এই লক্ষণগুলো উপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করাই শ্রেয়।
FAQs (প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন)
১. পেটব্যথা হলে শিশুকে ঘরোয়া কী ওষুধ দেওয়া যায়? সাধারণ পেটব্যথার ক্ষেত্রে ওরস্যালাইন বা হালকা সেদ্ধ খাবার দেওয়া যেতে পারে। তবে ওষুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।
২. কোন বয়স থেকে কৃমির ওষুধ দেওয়া উচিত? ৬ মাস বয়স থেকে প্রতি ৬ মাস অন্তর কৃমির ওষুধ দেওয়া যায়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
৩. শিশুর পেটব্যথা মানে কি সবসময় ইনফেকশন? না, পেটব্যথার কারণ হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, অ্যালার্জি বা হজমজনিত সমস্যা।
৪. ডায়রিয়ার সময় কী খাওয়ানো উচিত? ওরস্যালাইন, হালকা খিচুড়ি, কলা, সেদ্ধ আলু ও স্যুপ খাওয়ানো যেতে পারে। দুধ ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
৫. খাবারে অ্যালার্জি কীভাবে শনাক্ত করা যায়? সন্দেহজনক খাবার বাদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে অ্যালার্জি টেস্ট করাতে হবে।
Comments
Post a Comment