গর্ভাবস্থায় সিগারেট খেলে বা মদ্যপান করলে কী হয় – জেনে নিন বিস্তারিত
গর্ভাবস্থায় সিগারেট খেলে বা মদ্যপান করলে কী হয় – জেনে নিন বিস্তারিত
গর্ভাবস্থা নারীর জীবনের একটি অমূল্য সময়। এই সময়ে মায়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত অনাগত শিশুর স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেকেই হয়তো না জেনে বা অবহেলাভরে গর্ভাবস্থায় সিগারেট বা মদ্যপানের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাস চালিয়ে যান। এই পোস্টে আমরা জানব গর্ভাবস্থায় ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবনের ভয়াবহ প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে, যাতে আপনি ও আপনার প্রিয়জনরা সচেতন হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
গর্ভাবস্থায় ধূমপানের (সিগারেট) ক্ষতিকর প্রভাব ,,
সিগারেটে থাকে নিকোটিন, টার, কার্বন মনোক্সাইড সহ প্রায় ৭,০০০টি রাসায়নিক উপাদান, যার অনেকগুলোই শিশুর জন্য বিষাক্ত।
১. প্লাসেন্টার কার্যক্ষমতা কমে যায়
নিকোটিন রক্তনালীগুলো সংকুচিত করে দেয়, যার ফলে প্লাসেন্টার মাধ্যমে শিশুর কাছে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে বাধা তৈরি হয়।
২. গর্ভপাত ও মৃত শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়ে
ধূমপান গর্ভকালীন সময়ে মিসক্যারেজ, স্টিলবার্থ (মৃত শিশুর জন্ম) ও সময়ের আগেই প্রসবের (preterm birth) সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
৩. শিশুর ওজন কম হয়
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা গর্ভাবস্থায় সিগারেট খান, তাদের শিশুদের জন্মের সময় ওজন গড়পড়তা অপেক্ষা ৪০০-৫০০ গ্রাম কম হয়।
৪. শিশুর ফুসফুস ও মস্তিষ্কে সমস্যা
সিগারেটের বিষাক্ত উপাদান শিশুদের নিউরোলজিক্যাল ও রেসপিরেটরি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যার মধ্যে অ্যাজমা, লার্নিং ডিজঅর্ডার, এমনকি আচরণগত সমস্যা অন্তর্ভুক্ত।
গর্ভাবস্থায় মদ্যপানের ভয়াবহতা
মদ বা অ্যালকোহল গর্ভাবস্থায় কোনো মাত্রাতেই নিরাপদ নয়। অ্যালকোহল খুব সহজেই প্লাসেন্টা পেরিয়ে ভ্রূণের মধ্যে প্রবেশ করে, এবং তার বেড়ে ওঠা ব্যাহত করে।
১. ফিটাল অ্যালকোহল স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (FASD)
এই রোগের ফলে শিশুর মস্তিষ্ক, মুখমণ্ডল, হৃদপিণ্ড, কিডনি এবং অন্যান্য অঙ্গের গঠনগত ত্রুটি হতে পারে। এই ধরনের শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, যা সারাজীবন ভোগায়।
২. শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা
FASD-ভুক্ত শিশুরা শিখতে সমস্যা, আচরণগত সমস্যা, সামাজিক যোগাযোগে অসুবিধা ইত্যাদি সমস্যায় ভোগে।
৩. গর্ভপাত ও অকাল প্রসব
মদ্যপানের কারণে গর্ভপাতের সম্ভাবনা বেড়ে যায়, এবং অকাল প্রসবের ঝুঁকিও বাড়ে।
৪. নবজাতকের হঠাৎ মৃত্যুর ঝুঁকি (SIDS)
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, গর্ভাবস্থায় মদ্যপান করলে শিশুর Sudden Infant Death Syndrome (হঠাৎ নিঃশব্দে শিশুমৃত্যু) এর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
প্যাসিভ স্মোকিং ও প্যাসিভ অ্যালকোহল এক্সপোজারও ক্ষতিকর
শুধু সরাসরি সিগারেট বা মদ্যপান করলেই ক্ষতি হয় না, ধূমপায়ী বা মদ্যপায়ী পরিবেশে থাকা সত্বেও গর্ভবতী নারী এবং অনাগত শিশুর উপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। তাই পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের উচিত সচেতন হওয়া এবং গর্ভবতী মায়ের পাশে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা।
কীভাবে এই অভ্যাস ত্যাগ করা সম্ভব?
চিকিৎসকের পরামর্শ: প্রেগনেন্সির সময় ধূমপান বা মদ্যপান ছাড়ার জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যকর্মী বা থেরাপিস্টের সহায়তা নিতে পারেন।
সাপোর্ট গ্রুপ: ধূমপান ও অ্যালকোহল ছাড়ার জন্য বিভিন্ন অনলাইন বা অফলাইন গ্রুপ রয়েছে, যেখানে মানসিক সমর্থন পাওয়া যায়।
সচেতনতা বৃদ্ধি: আপনার পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে সচেতনতা ছড়িয়ে দিন যাতে অন্যরাও সচেতন হয়।
গর্ভাবস্থায় সিগারেট খাওয়া বা মদ্যপান করা শুধু মাতৃস্বাস্থ্যের উপর নয়, অনাগত সন্তানের সারাজীবনের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি কেবল শারীরিক সমস্যা নয়, একটি নৈতিক দায়িত্বও বটে — একটি নতুন জীবনের জন্য নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা।
তাই আজই সিদ্ধান্ত নিন — গর্ভাবস্থায় ধূমপান ও মদ্যপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করুন।
আপনি যদি এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, তাহলে শেয়ার করে অন্যদেরও সচেতন করতে ভুলবেন না।


Comments
Post a Comment